• রোববার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
  • ||

ফরিদপুর মেডিকেলে কেনাকাটায় ‘পুকুর চুরি’  

প্রকাশ:  ২০ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:০৮
নিজস্ব প্রতিবেদক

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় বড় ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক ও তার সহযোগীরা অর্থ লোপাটে জড়িত। তাদের কেনাকাটায় সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ের (পিপিআর) নির্দেশনা মানা হয়নি। এ মেডিকেল কলেজের কেনাকাটায় পুকুর চুরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

২০১৩-২০১৫ সময়কালে এমন তুঘলকি কাণ্ড ঘটেছে। ওই সময় দায়িত্বে ছিলেন ডা. এ বি এম সামসুল আলম, ডা. মো. এনামুল হক, ডা. মো. ওমর ফারুক খান ও ডা. গণপতি বিশ্বাস। এরা সবাই ওই সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক ও প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে কমিটিকে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

বুধবার (২০ নভেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।

সংসদীয় কমিটি এই অনিয়ম-দুর্নীতিকে ‘পুকুর চুরি’ বলে আখ্যায়্তি করেছে। পরে এই দুর্নীতি-অনিয়মের বিষয়টি ‘অধিকতর’ তদন্তের জন্য কমিটির সদস্য মুহিবুর রহমান মানিককে আহ্বায়ক করে সংসদীয় সাব কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সাব কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন আ. ফ. ম রুহুল হক, মো. আব্দুল আজিজ ও জাকিয়া নূর।

জানতে চাইলে সাব কমিটির আহ্বায়ক এই প্রতিবেদককে বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে দুর্নীতির বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। আমাদের মনে হয়েছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, বাস্তবে ঘটেছে তারও বেশি। এক কথায় বলতে গেলে ‘পুকুর চুরি’ হয়েছে। এই দুর্নীতির গভীরে যেতে সংসদীয় সাব কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জানা গেছে, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় দুর্নীতি-অনিয়মের বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে তিন পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া হয়েছে। এতে দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি সরবরাহ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে ধরা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা সংক্রান্ত ২০০৮ সালের নির্দেশনা অনুসারে ২ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে ক্রয় কার্যক্রম সচিবের অনুমোদনের জন্য পাঠানো বাধ্যতামূলক। তবে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের ১০ কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের চুক্তি করার আগে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন গ্রহণ করা হয়নি।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০১৩-১৪ এবং ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে রাজস্ব খাতে ২০ কোটি এবং উন্নয়ন খাতে ৩০ কোটি মোট ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়।

উন্নয়ন প্রকল্পের ৩০ কোটি টাকার মধ্যে ২০ কোটি ৬৩ লাখ ৩৪ হাজার টাকায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্রয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে। তাতে দেখা গেছে যন্ত্রপাতির মধ্যে সবচেয়ে দামি যন্ত্র হিসাবে দেখানো হয়েছে ইরিডিয়াম গ্রেড থেরাপি যন্ত্র (Iridium grade theraphy), যেটা ক্যান্সার থেরাপির কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে পিপি, কার্যাদেশ ও চুক্তিতে যে নাম লেখা আছে তাতে ওই নামে কোনো যন্ত্র পাওয়া যায়নি। সরবরাহকারীর প্রতিনিধি না থাকায় বাক্সটি খোলা হয়নি। তবে দরপত্রের সঙ্গে যে ক্যাটালগ এবং বাক্স সরবরাহ করা হয়েছে তার মধ্যে যে যন্ত্রটি সংরক্ষিত আছে তার বৈজ্ঞানিক নাম—ব্রোকি থেরাপি এবং এর পরিবর্তে যে যন্ত্রটি সরবরাহ করা হয়েছে সেটি যান্ত্র নয়, তা রেডিও অ্যাকটিভিটিস আইসটে ইরিডিয়াম ১৯২ গ্রেড সোর্স নামে স্বীকৃত।

ক্যান্সার থেরাপি কাজে ব্যবহার করার জন্য ব্রোকি থেরাপি যন্ত্রটি স্থাপন ও সচল করা হয়নি। যন্ত্রপাতি স্থাপনের অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং রুম রেনোভেশনের পূর্বেই অত্যধিক মূল্যবান আইসিইউ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়েছে।

একাধিক সংখ্যক দরপত্র বিক্রি করা হলেও ভারী যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে কেবলমাত্র একটি করে দরপ্রস্তাব পাওয়া গেছে। ফলে যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে সঠিক দর যাচাই বা তুলনা করা হয়নি।

রাজস্ব খাতে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে একই বিজ্ঞপ্তি একাধারে দুই অর্থ বছরের জন্য দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রদানের বিধান না থাকলেও ২০১৩-১৪ এবং ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের জন্য একত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। যা পিপিআর ২০০৮ এর সম্পূর্ণ পরিপন্থি।

এ ছাড়া সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতির ছবি পর্যালোচনায় কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, ১০ কোটি টাকা দিয়ে দুটি বিলের মাধ্যমে ১০টি আইটেমের বিপরীতে যে অর্থ দাবি করা হয়েছে তা বাস্তব সম্মত নয়। উদাহরণ স্বরূপ ১টি থ্রি হেড কার্ডিয়াক স্টেথস্কোপ এর ইউনিট মূল্য ১ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা ধরা হয়েছে, যা অস্বাভাবিক বলে মনে করছে সংসদীয় কমিটি।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক বলেন, যন্ত্রপাতি ক্রয়ে কিছু অনিয়ম হয়েছে। তবে ১০ কোটি টাকার সব তো আর অনিয়ম হয়নি। কী কী অনিয়ম হয়েছে তা খতিয়ে দেখতেই কমিটি করা হয়েছে।

বুধবার সংসদ ভবনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য আ ফ ম রুহুল হক, মহিবুর রহমান মানিক, মো. মনসুর রহমান, মো. আব্দুল আজিজ ও সৈয়দা জাকিয়া নূর অংশ নেন।

পূর্বপশ্চিম বিডি/ওআর

ফরিদপুর,মেডিকেল,পুকুর চুরি,স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত