• বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

৬ বছরে ১০ খুন-ধর্ষণ, প্রমাণ রাখেননি ধরাও পড়েননি

প্রকাশ:  ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ১১:০৯ | আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৩৩
নিজস্ব প্রতিবেদক
দুর্ধ্বর্ষ খুনি বাবু শেখকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

আত্মস্বীকৃত এক ভয়ংকর খুনির নাম বাবু শেখ ওরফে আনোয়ার হোসেন ওরফে আনার ওরফে কালু। একজন ঠান্ডা মাথার খুনি।বেশির ভাগ খুনই তিনি করেছেন রাতের বেলায়। এভাবে ছয় বছরে খুন করেছেন ৯ নারী ও ১ শিশু। নিহতদের পাঁচজনকে হত্যার আগে ধর্ষণও করেছেন তিনি।

নওগাঁর রানীনগর উপজেলার হরিশপুর গ্রামের জাহের আলীর ছেলে বাবু শেখ। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই খুনি কিছুদিন আগে নাটোর জেলা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। এরপর পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে একে একে সব খুনের কথা স্বীকার করেন তিনি। এসব খুনের দায় স্বীকার করে সম্প্রতি কয়েক দফায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বাবু শেখ।

বাবু শেখকে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদে সবচেয়ে বেশি সময় খাটিয়েছেন পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আকরামুল ইসলাম। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, তাঁর কর্মজীবনে তিনি এ ধরনের খুনির দেখা পাননি। বাবু শেখ ঠান্ডা মাথায় খুন করে গেছেন, কিন্তু প্রমাণ রেখে যাননি। তাঁকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে পেশাদার খুনি চক্রকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

নাটোরের পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তার সঙ্গে খুনে অংশ নিয়েছেন এমন অন্তত সাতজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এ তালিকায় তাঁর একমাত্র ছেলে ও মেয়ের স্বামীও রয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একের পর এক খুন করলেও বাবু শেখ কখনো ধরা পড়েননি। এমনকি সন্দেহের তালিকাতেও ছিলেন না তিনি। সেই কারণে প্রতিটি খুনের ঘটনায় আসামি হয়েছে অন্যরা। তাঁদের একজনের যাবজ্জীবন সাজাও হয়েছে। একজন রিমান্ড শেষে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে সাত মাস ধরে হাজত খাটছেন।

বাবু শেখের হাতে প্রথম বলি হন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার বাসুদেবপুর গ্রামের ওসমান গণির স্ত্রী রোকেয়া বেগম (৪৫)। ২০১৩ সালের ২১ আগষ্ট রাতে বাবু শেখ তিন সঙ্গীকে নিয়ে রোকেয়ার ঘরে ঢোকেন। ওই গৃহবধূকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করে পালিয়ে যান বাবু শেখ। এছাড়া, ২০১৪ সালের ৬ মে রাতে নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা মোল্লাপাড়া গ্রামের আব্দুর রশিদের মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া মরিয়ম খাতুন ওরফে লাবণী (১৩) ধর্ষণ ও খুনের শিকার হয়। বাবু শেখের দেওয়া জবানবন্দিতে জানা যায়, তিনি ও তার শ্যালক রইস মই দিয়ে ওই কিশোরীর ঘরে ঢোকেন এবং দুজনেই তাকে ধর্ষণ করেন। পরে বালিশ চাপা দিয়ে লাবণীকে হত্যা করে পালান তাঁরা।

২০১৪ সালে লাবণীকে ধর্ষণ ও হত্যার পর পুলিশের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় বাবু শেখ ঢাকায় চলে যান। সেখানে তিনি চা বিক্রি শুরু করেন।

গত ১৫ মে রাতে নলডাঙ্গার বাঁশিলা উত্তর পাড়ার মাহমুদুল হাসানের স্ত্রী হালিমা খাতুনকে (২০) ধর্ষণের পর হত্যা করেন বাবু শেখ। এ সময় তাঁর প্রতিবন্ধী ছেলে আব্দুল্লাহকে (২) বাড়ির পাশের পুকুরে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের বাবা ওমর ফারুক বাদী হয়ে নিহত গৃহবধূর দেবর মাহাবুল আলমকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

বাবু শেখের এক আত্মীয়ের বাড়ি টাঙ্গাইলে। সেখানে বেড়াতে গিয়েও তিনি চুরি করার জন্য দুই নারীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। গত ৯ জুলাই রাত ১০টার দিকে জেলার সখীপুর উপজেলার হাতীবান্ধা গ্রামের বাবর আলীর স্ত্রী সমলা বেওয়াকে (৬০) একা পেয়ে তাঁর ঘরেই হত্যা করেন বাবু শেখ।

৯ অক্টোবর রাত আড়াইটায় নাটোরের লালপুর উপজেলার নারী আনসার সদস্য সাহেরা বেগমের গলার চেইন চুরি করতে তাঁর শোবার ঘরে ঢোকেন বাবু শেখ, তার সহযোগী আসাদুল ও রুবেল।

প্রথমে তাঁরা ওই নারীকে ধর্ষণ এবং পরে গলা টিপে হত্যা করেন। সবশেষে ওই নারীর গলার স্বর্ণের চেইন, কানের দুল ও ১টি মোবাইল ফোন চুরি করে নিয়ে নাটোরের দিকে ফিরতে থাকেন তাঁরা। এক কিলোমিটার যাওয়ার পরই তাঁদের দ্বিতীয় খুন করার ইচ্ছে জাগে। জয়ন্তীপুর গ্রামে রাস্তার পাশের এক বাড়িতে জানালা দিয়ে অমেজান বেওয়া (৬০) নামের এক বৃদ্ধাকে ঘুমাতে দেখেন তাঁরা। খোলা দরজা দিয়ে তাঁরা ওই ঘরে ঢুকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ঘুমন্ত বৃদ্ধাকে হত্যা করেন। শোকেসের কাচ ভাঙতে গিয়ে জোরে শব্দ হওয়ায় আশপাশের লোকজন ছুটে এলেও অল্পের জন্য খুনিরা ধরা পড়েননি। এই দুটি ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

আনসার সদস্য সাহেরা বেগমের চুরি করা মোবাইল ফোনটি ব্যবহার শুরু করে বাবু শেখের শ্যালক রুবেলের ছেলে। পুলিশ ওই মোবাইল ফোনে আড়ি পাতে। ফোনটির ব্যবহারকারীর গতিবিধির ওপর নজরদারি শুরু করা হয়। একপর্যায়ে মোবাইল ফোনসহ রুবেল ও তাঁর ছেলেকে পুলিশ আটক করে। তাঁদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে বাবু শেখকে নাটোর রেলস্টেশন থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।

বাবু শেখকে কয়েক দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। বাবু শেখের দাবি, রানীনগরের এক ইউপি চেয়ারম্যান তাকে একটি হত্যা মামলায় মিথ্যাভাবে জড়ান। সেই রাগে তিনি গ্রাম ছেড়ে নাটোরে চলে আসেন। প্রথম দিকে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মাছ মেরে জীবিকা অর্জন করতেন। পরে কাজকর্ম না হওয়ায় তিনি ‘জাল পার্টি’তে যোগ দেন। জাল পার্টির লোকজন মাছ মারার অছিলায় গ্রামে গ্রামে চুরি করে বেড়ায়। চুরি করতে গিয়ে নারী ধর্ষণ ও খুনের নেশায় জড়িয়ে পড়েন তিনি।

কেন বারবার নারীদের খুন করেন—এই প্রশ্নের জবাবে বাবু শেখ বলেন, তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে সব সময় দুর্বলদের ওপর হামলা করতেন। যেসব নারী একা ঘরে ঘুমান এবং শারীরিকভাবে দুর্বল, তাঁদের হত্যা করে চুরি করা সহজ। তাই নারীদের খুন করতেন। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় এসব নারীকে ধর্ষণও করতেন তিনি। বাবু শেখ আরও বলেন, ‘আমি ভুল বুঝতি পারিছি। আমাক ভালো হওয়ার সুযোগ দিলে ভালো হয়ি যাব।’

বাবু শেখ জানিয়েছেন, তিনি জীবনে শুধু একজন নারীকেই ধর্ষণের পর খুন করেননি। তবে ১৫০ টাকা চুরি করেছিলেন ওই নারীর বাড়ি থেকে। এ ঘটনা ঘটেছিল নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায়। খুন না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই নারী ধর্ষণে বাধা দেয়নি। তাই মারিনি।’ ওই ঘটনার শিকার নারী আজও মামলা করেননি।

পূর্বপশ্চিমবিডি/ এআর

বাবু শেখ,১০ খুন
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত