• বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

কাউন্সিলর মঞ্জুর চাঁদার খনি রাজধানী মার্কেট

প্রকাশ:  ০২ নভেম্বর ২০১৯, ১১:১৬
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
ফাইল ছবি

ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু রাজধানী সুপার মার্কেটকে বানিয়েছিলেন তার টাকার খনি। কোনো ব্যবসায়ী যদি দোকানে আইটেম পরিবর্তন করতেন, তাহলে মঞ্জুকে দিতে হতো দুই লাখ টাকা চাঁদা। আর জেনারেটর বাণিজ্য করতে লোডশেডিং না হলেও মার্কেটের বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিতেন। খেয়াল-খুশিমতো ওই মার্কেটে দোকান নির্মাণের পর মালিকানা দাবি করে বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। দম্ভ করে মঞ্জু বলতেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁর কিছুই করতে পারবে না।

রাজধানীর হাটখোলা রোডের ১৫/২ নম্বর বাড়িটিও দখল করে নিজের বলে দাবি করেন মঞ্জু। একটি ফ্ল্যাট কিনে পরে ওই বাড়ির মালিককে ভয়ভীতি দেখিয়ে উচ্ছেদ করে নিজের নামে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে মালিক বনে যান। তার ও তার বাহিনীর ভয়ে তটস্থ ছিল এলাকাবাসী। একইভাবে রাজধানী মার্কেটেও দুটি দোকান লিজ নিয়ে একপর্যায়ে পুরো মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেন মঞ্জু। রাজধানী মার্কেটের ব্যবসায়ী, স্থানীয় লোকজন এবং র‌্যাব-পুলিশের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গতকাল শুক্রবার রাজধানী মার্কেটে গিয়ে দেখা গেছে, আগের দিন কাউন্সিলর মঞ্জু র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়ায় আনন্দ প্রকাশ করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা একে অন্যকে মিষ্টিমুখ করাচ্ছেন। গত ১১ বছর মনজু ও তার বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিলেন ব্যবসায়ীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় কাউন্সিলর ও সরকারি দলের রাজনীতি করায় নিজেকে ওই এলাকার রাজা ভাবতেন মঞ্জু। তার বিরুদ্ধে র‌্যাব-পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করলেও পাত্তা দিতেন না মঞ্জু। তিনি বলে বেড়াতেন, ‘আমি এই এলাকার ডিসি, ম্যাজিস্ট্রেট সব। আমার বিষয়ে কিছু জানতে হলে আমার কাছে আসতে হয়। আমি কারো কাছে যাই না।’

১১ বছর আগে দুটি দোকান লিজ নিয়ে রাজধানী মার্কেটে প্রবেশ করেন মঞ্জু। এরপর পুরো মার্কেটে তার আধিপত্য বিস্তার করতে ক্যাডার ধরনের কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জোগাড় করেন। ওই সময় মার্কেটে ব্যবসায়ীদের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন লুত্ফর রহমান নামের একজন ব্যবসায়ী। সেক্রেটারি ছিলেন ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন ঢালী। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করেন মঞ্জু। ২০০৯ সালে একদিন রাতে মঞ্জু তার ক্যাডার বাহিনী নিয়ে ব্যবসায়ী সমিতির অফিস থেকে নির্বাচিত সভাপতি ও সেক্রেটারিকে জোর করে বের করে তালা ঝুলিয়ে দেন। মঞ্জু তখন ওই এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর। তিনি জানিয়ে দেন, তার কথা ছাড়া আর রাজধানী মার্কেট চলবে না। পরদিন থেকে তিনি নিজেকে মার্কেটের স্বঘোষিত সভাপতি দাবি করেন। সেই থেকে বর্তমান পর্যন্ত মঞ্জুই রাজধানী মার্কেটের সভাপতি। আর এই সময়ের মধ্যে ওই মার্কেটে চালিয়েছেন যথেচ্ছ চাঁদাবাজি।

ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার ঘোষিত বিদ্যুৎ বিল প্রতি ইউনিট ১০ টাকা। কিন্তু প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে দিতে হয় ১৩ টাকা ৫০ পয়সা। প্রতি মাসে ৮-১০ লাখ টাকা শুধু বিদ্যুৎ থেকেই চাঁদাবাজি করতেন মঞ্জু।

২০ বছর আগে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের সাড়ে চার বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয় রাজধানী সুপার মার্কেট। ১৪ জন ব্যবসায়ী মার্কেটটি লিজ নিয়েছিলেন। তাদের অধিকাংশ এরই মধ্যে মারা গেছেন। তাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজধানী সুপার মার্কেটে ওই সময় যারা দোকান বরাদ্দ নিয়েছিলেন, প্রতি দোকানের জন্য দিতে হয়েছিল ২৫ হাজার টাকা। এরপর প্রতি দোকান থেকে মাসে ভাড়া নেওয়া হতো ২৮০ টাকা। যা পর্যায়ক্রমে বর্তমানে উঠেছে এক হাজার টাকায়। জমি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের হলেও নিয়ন্ত্রণ নেই। নিয়ন্ত্রণ মঞ্জুর হাতে।

এক ব্যবসায়ী জানান, কিছুদিন আগে মার্কেটের গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় কয়েকটি দোকান নির্মাণ করে প্রতিটি ২৩ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন মঞ্জু। এসব দোকান বিক্রি করেই মঞ্জু হাতিয়ে নিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা।

আরেক ব্যবসায়ী জানান, মার্কেটের জন্য তিনটি জেনারেটর রয়েছে। সেই জেনারেটর থেকেও ফায়দা লুটেছেন মঞ্জু। বিদ্যুৎ না গেলেও মঞ্জুর নির্দেশে বিদ্যুৎ বন্ধ করে জেনারেটর চালিয়ে মাসে পাঁচ-ছয় লাখ টাকা নিতেন তিনি। আর প্রত্যেক দোকানকে মাসোয়ারা দিতে হতো মঞ্জুকে। কেউ প্রতিবাদ করলে তার দোকানের বিদ্যুতের লাইন কেটে দিতেন মঞ্জুর ক্যাডাররা। তার ক্যাডারদের মধ্যে রয়েছেন—সায়েম, সাইদুলসহ আরও কয়েকজন। মঞ্জুর নির্দেশে মার্কেটের চারপাশের ফুটপাতে দোকান বসানো হয়েছে। প্রতিটি দোকান থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। ক্যাডার সাইদুল চাঁদার ওই টাকা মঞ্জুর হাতে তুলে দেন। মার্কেটের চারপাশের ফুটপাতে শতাধিক দোকান থেকে প্রতিদিন চাঁদা তোলা হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। মঞ্জুর ক্যাডার বাহিনীর সাইদুল, বোমা সায়েমী, আওলাদ, জাফর সানি, আবদুল হকদের হাতে রাজধানী সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ীরা ৯ বছর ধরে জিম্মি বলে জানিয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।

কোনো দোকানে কাপড়ের পরিবর্তে যদি বেডশিট ওঠাতে চাইতেন কোনো ব্যবসায়ী, এই আইটেম পরিবর্তনের জন্য মঞ্জুকে দিতে হতো দুই লাখ টাকা চাঁদা। না দিলে দোকান বন্ধ। কয়েক মাস আগে একটি ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন মঞ্জু। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ওই দোকানটিই বন্ধ করে দেয় মঞ্জুর ক্যাডার বাহিনী। পরে এক লাখ ২০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে রক্ষা পান ফাস্ট ফুড ব্যবসায়ী।

রাজধানী সুপার মার্কেটের দোকানি আশরাফ উদ্দিন টিটু বলেন, মঞ্জু হলেন রাজধানী সুপার মার্কেটের অঘোষিত রাজা। তার বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলতে পারেন না। কেউ চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করলে তার বিরুদ্ধে ভুয়া মামলা দেন মঞ্জু। দোকানের বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে হয়রানি করেন।

জানা গেছে, অবৈধভাবে মঞ্জু ১১০টি দোকান বিক্রি করেন। প্রতিটির দাম ১০ লাখ টাকা। এ বাবদ তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন ১০ কোটি টাকার বেশি।

কয়েক বছর আগে হাটখোলা রোডের ১৫/২ নম্বর চারতলা গ্লোব ভবনের বাড়ির চতুর্থ তলায় একটি ফ্ল্যাট কেনেন মঞ্জু। বাড়ির মালিক থাকতেন দ্বিতীয় তলায়। পরে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে উচ্ছেদ করেন। এরপর মঞ্জু কিছু ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে পুরো বাড়ির মালিক হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেন। র‌্যাবের অভিযানে মঞ্জু গ্রেফতারের পর ওই বাড়ির প্রকৃত মালিক র‌্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। মঞ্জুকে সঙ্গে নিয়ে ওই বাড়িতেই অভিযান চালায় র‌্যাব।

জানতে চাইলে র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফিউল্লাহ বুলবুল বলেন, তাকে গ্রেফতারের পর অনেকে অভিযোগ নিয়ে আসছেন। আগে তারা অভিযোগ করতে ভয় পেতেন। তার বিরুদ্ধে ওয়ারী থানায় দুটি মামলা হয়েছে। মামলা দুটি তদন্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হবে। যদি মামলা আমরা পাই, তাহলে তার অপরাধ জগৎ ও সহযোগীদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

ওয়ারী থানায় দায়ের করা মামলার তদন্তভার পেয়েছেন ওয়ারী থানার সাব-ইন্সপেক্টর হারুনুর রশীদ। তিনি বলেন, আমরা তাকে রিমান্ডে পেয়েছি। এখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর তিনি বাড়ি দখল করেছেন এমন খবর শোনা যাচ্ছে। তবে এখনো এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া আমরা অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলা তদন্ত করছি। ফলে বাড়ির বিষয়টি আমরা দেখছি না। সূত্র: কালের কণ্ঠ


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

কাউন্সিলর মঞ্জু,র‌্যাব,চাঁদাবাজি,রাজধানী মার্কেট
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত