• সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

ভর্তি জালিয়াত চক্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ শিক্ষার্থী

প্রকাশ:  ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৪৯
কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

পাবলিক ও সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার সময় তৎপর হয়ে উঠে ভর্তি জালিয়াতি চক্র। ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রতি পরীক্ষার্থীকে চান্স পাইয়ে দেয়ার শর্তে লেনদেন করে থাকে এই চক্র। প্রক্সি ও প্রশ্নপত্র ফাঁস এই দুই পদ্ধতিতে জালিয়াত চক্র পরিচালিত হয়। বর্তমানে প্রক্সি জালিয়াত তাদের জন্যে নিরাপদ হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই চক্র সক্রিয়। এইসব কথা উঠে এসেছে জালিয়াত চক্রের এক সদস্যের ফাঁস হওয়া ৭মিনিট ৩৫ সেকেন্ড এর অডিও রেকর্ডে। যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থানীয় সরকার ও নগর উন্নয়ন বিভাগের ১৮১২৩৮৩৯ রোলধারী ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তার নাম সাব্বির রহমান।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক(সম্মান) প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার পূর্বে এক শিক্ষার্থীকে প্রক্সি প্রক্রিয়ায় ভর্তি করিয়ে দিবে এমন একটি চুক্তি করার কথোপকথন রেকর্ড আকারে ফাঁস হয়। যেখানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শফিক খানের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছে। ফাঁস হওয়া রেকর্ডে বলা হয়েছে শফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন সিন্ডিকেট। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতে ঝামেলা হলে সব সমস্যার সমাধান করে থাকে শফিক খান। তার এই ভর্তি বাণিজ্যের উপার্জিত অর্থে বিলাস বহুল জীবন যাপন করে। তার হাতের ঘড়ি, মোবাইল, বাইক ও মাইক্রোর মূল্য অনেক। শুধু ঘড়ির দামি ২৭ হাজার টাকা। প্রতিদিন ২ প্যাকেট সিগেরেট আর মদ প্রয়োজন হয় তার। প্রতি সিজনে ৫০ লাখ টাকা আয় তার। এই সকল প্রকার ব্যয়ের কোনো অর্থ সে বাসা থেকেও আনেন না বলে জানা যায় এই চক্রের সদস্য সাব্বির মুখে । এমনকি শফিক নিজেও জালিয়াতি করে ভর্তি হয় বলে জানা যায় এই ফাঁস হওয়া রেকর্ড থেকে ।

এই ভর্তি পরীক্ষায় ৭ জন পরিক্ষার্থী আছে তার(সাব্বিরের) যাদের প্রক্সি জালিয়াতি করে ভর্তি করা হবে। তার একমাত্র ইচ্ছা এইবারের টাকা দিয়ে একটা বাইক কিনবে। সাব্বির কেবল কবি নজরুল নয় জাহাঙ্গীরনগর, শাবিপ্রবি, মাওলানা ভাসানীতেও এই জালিয়াতি করে থাকে তার চক্রের মাধ্যমে যা তার ফাঁস হওয়া অডিওতে শোনা যায়।

চক্রের অন্যতম প্রধান হোতা শফিক খান এর পূর্বেও জালিয়াতি করে প্রশাসনের নজরে এসেছিলো। কিন্তু প্রশাসন থেকে কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই সে তার স্বাভাবিক শিক্ষা জীবন অতিবাহিত করে।

২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় ‘ডি’ ইউনিট-এ প্রথম শিফট এর প্রকাশিত ফলাফলে জালিয়াতি করে পঞ্চম স্থান অধিকার করে এই চক্রের আশ্রয়ে আসা এক পরীক্ষার্থী। নাম মারুফ রহমান যার রোল ১৩৮৫৮। সে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় এর সিএসই বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী তুষার জিন্না ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী আপেল মাহামুদ আকাশ এর মাধ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শফিক এর নেতৃত্ব দেয়া জালিয়াত চক্রের সদস্য সাব্বির এর মাধ্যমে সকল কার্যক্রম পরিচালনা করে। যার স্বীকারোক্তি দিয়েছে জালিয়াতি করে ভর্তি হতে আসা আটক শিক্ষার্থী মারুফ রহমান।

অভিযুক্ত তুষার জিন্না ফুলবাড়িয়া ইসলামী কলেজের আইসিটি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করছে।

গত বৃহস্পতিবার ৫ ডিসেম্বর ভর্তি হতে এসে আটক হওয়া শিক্ষার্থী মারুফ রহমান এর জবানবন্দী অনুযায়ী সাব্বির তার মোবাইল ফোনসহ সাথে আনা ব্যাগ নিয়ে যায়। অন্যদিকে এই কার্যে উৎসাহিত করে তুষার জিন্না যার সহযোগিতায় ছিলেন জাবি শিক্ষার্থী আপেল মাহমুদ আকাশ।

এ বিষয়ে শফিক খান, সাব্বির রহমান ও তুষার জিন্নার সাথে একাধিক ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে ফোন বন্ধ দেখায়। এবং তুষার জিন্না বর্তমানে পলাতক আছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্যদিকে আপেল মাহমুদ আকাশ মুঠোফোনে বলেন, এটি মিথ্যা এগুলোর সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই। আমি কেবল তুষার ভাইয়ের কথায় মারুফ এর বাসায় কথা বলেছি।

সাব্বির এর জড়িত থাকার বিষয়ে স্থানীয় সরকার ও নগর উন্নয়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান তানিয়া আফরিন তন্বী বলেন, অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনবে প্রশাসন। তবে সাব্বির এর নামের সাথে যেহেতু আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থী পরিচয়টা রয়েছে। আমরা রোববার বিভাগের শিক্ষকরা বসে এবিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবো।

জালিয়াত চক্রে সিএসই বিভাগের একাধিক শিক্ষার্থীর সংশ্লিষ্টতা প্রসঙ্গে বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. এ এইচ এম কামাল বলেন, যেহেতু বিভাগের একাধিক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে আমরা একাডেমিকভাবে বসবো এবং কাউনসিলিং এর ব্যবস্থা করতে হবে যেন ভবিষ্যতে এমন আর কেউ না করতে পারে। তুষার জিন্না নামের শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে ড্রপ আউট তাই তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আর শফিক নামের যে শিক্ষার্থী সে যদি সংশ্লিষ্ট থাকে এই কাজের সাথে তবে বিভাগ অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।

বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রক্টর ড. উজ্জ্বল কুমার প্রধান বলেন, জালিয়াতি করে ভর্তি হতে আসা শিক্ষার্থী আটক হয়েছে। তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে এবং তার দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো দুজন শিক্ষার্থীর সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছে। যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয় তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

উল্লেখ্য গত ৫ ডিসেম্বর আটক হওয়া জালিয়াতি করে পরীক্ষা দিতে আসা শিক্ষার্থীসহ অজ্ঞাত ৩ জনের বিরুদ্ধে পাবলিক পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যার সত্যতা নিশ্চিত করেছে ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।


পূর্বপশ্চিমবিডি/এস.খান

ভর্তি জালিয়াতি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close