• সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

কেমন আছেন তিতুমীরের সেই চোখ হারানো সিদ্দিক!

প্রকাশ:  ০৬ আগস্ট ২০১৯, ১৭:৪৩
ক্যাম্পাস প্রতিনিধি

২০১৭ সালের ২০ জুলাই রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত সরকারি কলেজের পরীক্ষার দাবিতে সহপাঠীদের সঙ্গে আন্দোলনে যান সিদ্দিক।

ওই আন্দোলনে পুলিশের খুব কাছ থেকে ছোড়া টিয়ারশেলের আঘাতে নিভে যায় দুনিয়ার আলো। তবে দমে যাননি সিদ্দিক। চোখের আলো ছাড়াই অনার্স তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষা দেন। যে পরীক্ষা ও এর ফলের দাবিতে বিশোর্ধ যুবক সিদ্দিকুর চোখের আলো হারান, আজও সেই ফলের অপেক্ষায় আক্ষেপ করতে হচ্ছে তাকে।

সিদ্দিকুরের চোখ হারানোর দুই বছর পূর্ণ হয়েছে গেল ২০ জুলাই। দীর্ঘ দুই বছরে আলোহীন জীবনে কেমন আছেন সিদ্দিকুর?

পরীক্ষায় আশানুরূপ রেজাল্ট না পাওয়ায় সম্প্রতি ঢাবি অধিভুক্ত বেগম বদরুনন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী মিতু আত্মহত্যা করে। মিতুর ঘটনাটি বন্ধুদের কাছ থেকে জানার পর প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন সিদ্দিক। বলেন, আমি না দেখতে পারলেও তো বেঁচে আছি, কিন্তু মিতু তো দুনিয়া থেকে চলেই গেল। আর কত মিতু যে ঝুলে আছে তা নাই বললাম। আমাদের জীবন থেকে দিন দিন সময় চলেই যাচ্ছে। যেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বন্ধু অনার্স-মাস্টার্স শেষে চাকরি করছে, সেখানে আমরা অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্টই পাচ্ছি না। পরীক্ষা দিলাম প্রায় ৬ মাস আগে। অজপাড়া গ্রাম থেকে প্রত্যেকটি শিক্ষার্থী ঢাকায় আসে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সবার স্বপ্ন আজ ফিকে হতে বসেছে। এখন দীর্ঘ সেশনজটে প্রভাব পড়ছে পরিবারের ওপরও। চোখ হারানোর পর থেকে সরকারের দেওয়া চাকরি করছেন সিদ্দিক। কিন্তু চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনা এবং সবকিছুরই খোঁজ রাখেন তিনি।

সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়ুয়া সিদ্দিক বলেন, অধিভুক্তি বাতিল হলে আমরা কোথায় যাব? বিকল্প ব্যবস্থা তো নেই। আবারও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গেলে সবার হতাশা আরও বাড়বে। মিতুর মতো দুর্ঘটনা ঘটতেও পারে! দুই বছর আগে তিতুমীর কলেজের ক্যাম্পাসেই বেশি সময় থাকা হতো সিদ্দিকের। জমিয়ে আড্ডা দিতেন। এখন তা নেই। এখন প্রত্যেকদিন অফিস আর বাসাতেই সময় কেটে যায় তার। আগের মতো সবাইকে দেখতে মন চায় সিদ্দিকুর রহমানের। বলেন, জন্ম থেকে যদি চোখে না দেখতাম, তাহলে মনকে বুঝাতে পারতাম। আমারও মন চায় প্রিয় মাকে দেখতে। কিন্তু পারি না।

অতীতের সুখস্মৃতি যে প্রায়ই হাতড়ে বেড়ান সিদ্দিক তা তার কথায় টের পাওয়া যায়। চোখ হারানোর আগে বন্ধুদের সঙ্গে সেন্টমার্টিন গিয়েছেন। তিন দিন জম্পেশ চষে বেড়িয়েছিলেন সেখানে। এখন আর ঘোরা হবে না......এ কথা বলেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন চোখ হারানো সিদ্দিক। জানান, প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখেন, আবারও চোখে দেখতে পারছেন। বন্ধুদের নিয়ে বই কিনতে নীলক্ষেত যাচ্ছেন। কলেজে ক্লাস করছেন। টিউশনি করাচ্ছেন। গত বছর নিজ এলাকা ময়মনসিংহে বিয়েও করেছেন সিদ্দিক। কিন্তু সেই স্ত্রীর মুখও দেখতে পারেন না। তার এসব আক্ষেপ আরও বাড়িয়ে দেয় ‘সেশনজট’। জানান, সবই মেনে নিলাম। কিন্তু যখন দেখি এখনও শিক্ষার অনিশ্চয়তার যাত্রা কাটেনি। শুনি গণহারে ফেল করছে, তখন আমাকে ‘শাহবাগের আন্দোলনটা’ খুবই পীড়া দেয়।

রাজধানীর তেজগাঁয়ে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন সিদ্দিকুর রহমান। বাসার কাছেই তার অফিস। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানির টেলিফোন অপারেটর পদে চাকরি করছেন সিদ্দিক। চাকরির বিষয়ে জানতে চাইলে বেশ স্বস্তির কথা জানান তিনি। বলেন, সম্প্রতি তার চাকরিটা স্থায়ী করা হয়েছে। প্রথমদিকে কাজ করতে একটু বেগ পেতে হতো, এখন সহকর্মীদের সহায়তা ছাড়া অনেক কাজ সহজে পারছেন। সহকর্মীরাও অনেক আন্তরিক। চোখ হারিয়ে গেলেও মনের আলো হারিয়ে যায়নি তরুণ সিদ্দিকের। আগের মতো এখনও আত্মবিশ্বাস রয়েছে। ইচ্ছা আছে ভবিষ্যতে শিক্ষকতা করার। অর্নাস পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মার্স্টাসে ভর্তি হবেন। ইতোমধ্যে কম্পিউটার ও ব্রেইল প্রশিক্ষণ কোর্স শেষ করেছেন। নিজ যোগ্যতায় হতে চান দেশের সর্বোচ্চ বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) ক্যাডার। একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনন্য ভ‚মিকা রাখতে চান সিদ্দিকুর রহমান।

জীবনে যা ঘটে গেছে তা নিয়ে আর ভাবতে চান না সিদ্দিক। ২০১৭ সালকেই ভুলে যেতে চান তিনি। ২০ জুলাইয়ের কথা মনে করতে চান না। বিভীষিকাময় ওইদিনটি সিদ্দিকের কাছে বিষাদের। চোখের জ্যোতি নিভিয়ে যাওয়া সিদ্দিকুর রহমানের এখন একটাই চাওয়া পুরো সেশনজটমুক্ত হোক ঢাবির অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজ। গ্রাম থেকে আসা শিক্ষার্থীদের স্বপ্নপূরণ হোক।

পূর্বপশ্চিমবিডি/আরএইচ

সিদ্দিক,তিতুমীর
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত