• রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

টিকটক কেন এতো সফল ও জনপ্রিয় হয়ে উঠলো?

প্রকাশ:  ০৫ আগস্ট ২০২০, ১২:২৮
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক

আলোচিত এই অ্যাপের নাম টিকটক। ভিডিও তৈরি ও শেয়ার করার অ্যাপ। অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে তরুণদের কাছে। সম্প্রতি চীনের তৈরি এই অ্যাপটি নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনীতি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকি

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাম্প যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের অপারেশন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। কিন্তু মার্কিন কোম্পানি মাইক্রোসফ্ট এটি কেনার জন্য দরকষাকষি চালিয়ে যাচ্ছে।

মি. ট্রাম্প এখন তার কথার সুর কিছুটা পরিবর্তন করে বলছেন, আমেরিকান কোন প্রতিষ্ঠান যদি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের ইউনিট ক্রয় করে তাহলে এই বিক্রি থেকে তার সরকারের একটা ভাগ দিতে হবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, মাইক্রোসফ্টের প্রধানকে টেলিফোন করে তিনি এই অর্থ দাবি করেছেন।

তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন কোন সমঝোতা না হলে তিনি চীনের বাইটড্যান্স মালিকানাধীন এই অ্যাপটি ১৫ই সেপ্টেম্বরে নিষিদ্ধ করে দেবেন।

টিকটকের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ হচ্ছে এই অ্যাপটি চীনা সরকারের কাছে তথ্য পাচার করছে। বেইজিং এবং টিকটক উভয়েই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই অর্থ দাবির সমালোচনা করছেন অনেকে। তারা বলছেন এর ফলে টিকটক ও মাইক্রোসফ্টের মধ্যে সমঝোতার পথ আরো কঠিন হয়ে পড়বে।

একজন আইনজীবী নিকোলাস ক্লেইন বলছেন, বেসরকারি কোন সমঝোতা থেকে সরকারের অর্থ দাবি করার কোন এখতিয়ার নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কী কারণে চীনা এই অ্যাপটি সারা বিশ্বে এতোটা জনপ্রিয় ও সফল হতে পারলো?

টিকটক কী

ভাইরাল হওয়া মজার মজার নাচ ও ঠোঁট মেলানো হাস্যকৌতুকের ভিডিও তৈরি ও শেয়ার হয় এই টিকটক অ্যাপে। অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদর কাছে এই অ্যাপ খুবই জনপ্রিয়।

এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর চাহিদা মতো যে কোন কিছুর সাথে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে ছোট ছোট ভিডিও তৈরি করে তা শেয়ার করা যায়।

আবার এর সাহায্যে নিজের পছন্দের গানের সাথে নাচ বা নানা ধরনের কমেডিও তৈরি করা সম্ভব। স্টিকার, ফিল্টার ও অগম্যান্টেড রিয়েলিটিও ব্যবহার করা যায় এসব ভিডিওতে।

ফ্রি এই অ্যাপটিকে ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপ ইউটিউবের ছোটখাটো সংস্করণ বলা চলে।

টিকটক ব্যবহারকারীরা এখানে এক মিনিট লম্বা ভিডিও পোস্ট করতে পারেন এবং এখানকার বিশাল তথ্যভাণ্ডার থেকে গান ‍ও ফিল্টার বাছাই করতে পারেন।

টিকটক দিয়ে অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েরা পরিচিত ফিল্মী ডায়লগ বা গানের সঙ্গে নিজেরা অভিনয় করে মজার মজার ভিডিও তৈরি করে থাকে।

একজন ব্যবহারকারীর যখন এক হাজারের বেশি ফলোয়ার হয় তখন তিনি তার ভক্তদের জন্য লাইভে আসতে পারেন।

শুধু তাই নয়, এখানে তিনি ডিজিটাল উপহারও গ্রহণ করতে পারেন যা অর্থের সাথেও বিনিময় করা যায়।

একজন ব্যবহারকারী যাকে অনুসরণ করেন তিনি তার ভিডিও দেখতে পারেন। এছাড়াও তিনি আগে যেসব বিষয়ে ভিডিও দেখেছেন তার ওপর ভিত্তি করেও তিনি নতুন নতুন ভিডিও দেখতে পারেন।

ব্যবহারকারীরা নিজেদের মধ্যেও ব্যক্তিগত বার্তা আদান প্রদান করতে পারেন এই অ্যাপের মাধ্যমে।

যারা কিছুটা অভিনয় করেন বা কমেডি করতে পারেন, তাদের নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার জন্য এই টিকটক একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উঠে এসেছে।

টিকটকের জনপ্রিয়তার পেছনে কারণগুলো হচ্ছে:

  • এসব ভিডিও আকারে ছোট
  • ব্যবহার করা সহজ
  • সবসময় এতে যুক্ত হয় নতুন নতুন ফিচার
  • ভিডিওতে নিজের কণ্ঠ মেলানো যাকে বলা হয় লিপ সিঙ্ক
  • ভিডিওতে অন্যের কণ্ঠ ব্যবহার

এই অ্যাপ কতো বড়ো?

২০১৯ সালের শুরু থেকেই ডাউনলোড চার্টের শীর্ষের কাছাকাছি অবস্থান করছে টিকটক।

গত বছর ইন্সটাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাটকে টপকে বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ ডাউনলোডকারী অ্যাপে পরিণত হয় এটি।

এই কোম্পানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৭৫ বিলিয়ন ডলার যা রাইড শেয়ারিং অ্যাপ উবারের চেয়েও বেশি।

করোনাভাইরাস সঙ্কটের সময় টিকটকের জনপ্রিয়তা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। লকডাউনের কারণে ঘরবন্দী মানুষের তীব্র আগ্রহ তৈরি হয় এই অ্যাপের প্রতি।

বলা হচ্ছে, টিকটক ও তার সহযোগী অ্যাপ দোইনের মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮০ কোটি। দোইন অ্যাপটি শুধু চীনেই ব্যবহার করা যায়।

জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারতে টিকটক নিষিদ্ধ করার আগে এটি সেখানে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। সেদেশে দশ কোটিরও বেশি মানুষ ইতোমধ্যে টিকটক ডাউনলোড করেছে।

২০১৮ সালে আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড করা অ্যাপ ছিল এই টিকটক। ইকোনমিক টাইমস পত্রিকা লিখছে, প্রতিমাসে গড়ে প্রায় দুই কোটি মানুষ টিকটক ব্যবহার করছে।

চীনের সঙ্গে টিকটকের সম্পর্ক কী

টিকটকের যাত্রা শুরু হয়েছিল ভিন্ন ভিন্ন তিনটি অ্যাপ হিসেবে। প্রথমটি ছিল মার্কিন একটি অ্যাপ যার নাম মিউজিক্যাল ডট লি। এটি শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে।

প্রযুক্তি বিষয়ক চীনা কোম্পানি বাইটড্যান্স ২০১৬ সালে একই ধরনের একটি অ্যাপ চালু করে যার নাম দোইন।

পরে বাইটড্যান্স টিকটক নাম নিয়ে সারা বিশ্বে তার প্রসার ঘটাতে শুরু করে এবং ২০১৮ সালে মিউজিক্যাল ডট লিকে কিনে নিয়ে তাকেও টিকটকের সাথে একীভূত করে ফেলে।

বাইটড্যান্স তার অ্যাপগুলোকে চীনা মালিকানা থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। এরই অংশ হিসেবে ডিজনির শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা কেভিন মায়ারকে টিকটকের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিযুক্ত করেছে।

টিকটক কতো ডাটা নেয়?

একজন ব্যবহারকারী যখন টিকটক ব্যবহার করেন তখন তার প্রচুর ডাটা খরচ হয়। ডাটার এই খরচ যেসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:

  • কোন ভিডিও দেখা হচ্ছে এবং মন্তব্য করা হচ্ছে
  • ব্যবহারকারীর লোকেশন বা অবস্থানের ডাটা
  • ফোনের মডেল এবং কোন অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে
  • লোকজন যখন টাইপ করে তখন তার কীস্ট্রোক রিদম কেমন অর্থাৎ ব্যবহারকারীর টাইপ করার ধরন

অ্যাপটির কিছু কিছু ডাটা খরচের ধরন দেখে অনেকেই অবাক হয়েছেন। খুব সম্প্রতি জানা গেছে এটি ব্যবহারকারীর কপি ও পেস্ট নিয়মিত মনে রাখে।

রেডিট, লিঙ্কডিনসহ আরো বহু অ্যাপেও এরকমটা হয়ে থাকে।

টিকটকের এই ডাটা খরচকে তুলনা করা যেতে পারে ফেসবুকের মতো সোশাল নেটওয়ার্কের সাথে। এই অ্যাপটিও প্রচুর ডাটা খরচ করে থাকে।

চীন কি গুপ্তচরের ভূমিকা পালন করতে পারবে?

টিকটক কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে বহু প্রশ্ন আছে। ডাটা সংরক্ষণ থেকে শুরু করে এর এলগরিদম নিয়েও রয়েছে অনেক রহস্য।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও অভিযোগ করেছেন যে যারা টিকটক ব্যবহার করেন শেষ পর্যন্ত তাদের সব তথ্য চীনের কমিউনিস্ট পার্টির হাতে গিয়ে পড়তে পারে।

কিন্তু টিকটক কর্তৃপক্ষ সবসময় বলে আসছে, ব্যবহারকারীর কাছ থেকে তারা যেসব তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো চীনের বাইরে সংরক্ষণ করা হয়।

তারা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ডাটা যুক্তরাষ্ট্রেই সংরক্ষণ করা হয়। তার ব্যাকআপ রাখা হয় সিঙ্গাপুরে। ইউরোপের গোপনীয়তা সংক্রান্ত ইউনিটও সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে।

ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকায় টিকটকের নীতি নির্ধারণ বিষয়ক প্রধান থিও বেরট্রাম বিবিসিকে বলেছেন, “ব্যবহারকারীরা চীনা কমিউনিস্ট সরকারের আঙ্গুলের নিচে চলে যাবে এই ধারণা সর্বৈব মিথ্যা।”

তবে তাত্বিকভাবে বলা যেতে পারে যে হুয়াওয়ের মতো টিকটকেরও বিদেশি ব্যবহারকারীর তথ্যের ব্যাপারে চীনা সরকার হয়তো বাইটড্যান্সের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

চীনে ২০১৭ সালে যে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়েছে সে অনুযায়ী দেশটির যেকোন সংগঠন অথবা নাগরিক রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে সাহায্য সহযোগিতা করতে বাধ্য।

মি. বেরট্রাম বলেছেন, “টিকটকের কাছে চীন সরকার যদি কখনো ব্যবহারকারীর তথ্য চাইতো, তাহলে আমরা অবশ্যই তাদেরকে না বলে দিতাম।”

তবে কমিউনিস্ট পার্টিকে অসন্তুষ্ট করলে তার পরিণতি কী হতে পারে সে বিষয়টি বাইটড্যান্সকে মনে রাখতে হবে।

এই কোম্পানির নিজের জনপ্রিয় সংবাদ বিষয়ক অ্যাপ টুটিয়াওকে ২০১৭ সালে একবার ২৪ ঘণ্টার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

চায়না মর্নিং পোস্টের খবর অনুসারে, অ্যাপটি প্রচারণাধর্মী ও অশালীন বিষয় ছড়াচ্ছে- বেইজিং ইন্টারনেট ইনফরমেশন অফিস এই অভিযোগ আনার পর অ্যাপটি কিছু সময়ের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

এছাড়াও গোয়েন্দা বিভাগের কথা মতো কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে এই কোম্পানি ও তার নেতৃত্বের ওপরেও তার বড় রকমের প্রভাব পড়তে পারে।

চীনা প্রচারণার জন্য কি টিকটক ব্যবহৃত হতে পারে?

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে সেন্সরশীপ।

চীনে ইন্টারনেট সার্ভিস সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত। অনেক ওয়েবসাইট চীনের ভেতরে যাতে দেখা না যায় সেজন্য আছে গ্রেট ফায়ারওয়াল অত্যন্ত কুখ্যাত।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান গত বছর রিপোর্ট করেছিল যে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর কিছু বিষয়ের ব্যাপারে টিকটকে কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। তার মধ্যে রয়েছে তিয়েনানমেন স্কয়ারের প্রতিবাদ এবং তিব্বতের স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন।

মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টও টিকটকের সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বলেছে, কোন ভিডিও অনুমোদন পাওয়ার ব্যাপারে চীনে এর কর্মকর্তাদের বক্তব্যই চূড়ান্ত।

কিন্তু বাইটড্যান্স বলছে, এধরনের গাইডলাইন ধীরে ধীরে বাতিল করা হয়েছে।

তার পরেও কারো কারো সন্দেহ যে অ্যাপটি পরিচালনার ক্ষেত্রে টিকটক হয়তো চীনা রাষ্ট্রেরই পক্ষ নিচ্ছে।

মার্কিন কংগ্রেসের সামনে বক্তব্য তুলে ধরতেও অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে টিকটক।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে- টিকটকের যদি গোপন করার কিছু না থাকে তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতাদের প্রশ্নের জবাব দিতে তাদের এতো অনীহা কেন? খবর: বিবিসি বাংলা


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

টিকটক,ট্রাম্প,অ্যাপ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close