• মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০, ৩০ আষাঢ় ১৪২৭
  • ||

করোনা-কারফিউয়ে ঘরে বসেই দেশে দেশে বিবর্ণ ঈদ উদযাপন

প্রকাশ:  ২৫ মে ২০২০, ০০:০২ | আপডেট : ২৫ মে ২০২০, ০০:১২
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সৃষ্টির নিয়মে সব কিছুরই শেষ রয়েছে। করোনার শেষ কবে? সেটা সুনিশ্চিত ভাবে কেউই বলতে পারছেন না। করোনা যে অনেক কিছু শেষ করে দিলো তাতে সন্দেহ নেই। মহামারি এই নভেল করোনাভাইরাস দুনিয়াকে বদলে দিয়েছে- শুনতে এখন ক্লিশে লাগতে পারে। কারণ, সবাই প্রতিনিয়তই তা অনুভব করছেন।সোমবার বাংলাদেশে উদযাপিত হবে খুশির ঈদ। রোববার (২৪ মে) মধ্যপ্রাচ্যসহ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে আজ ঈদ-উল-ফিতর পালিত হয়েছে। কিন্তু অবধারিতভাবেই বদলে গেছে উদযাপন। কভিড-১৯ মহামারীতে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানরা অনলাইন যোগাযোগে ঈদ উদযাপন করছেন।

বেশিরভাগ দেশে রোববার পবিত্র ইদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। তবে এবারের ঈদ উৎসব অন্য যেকোনো বারের চেয়ে ছিল ভিন্ন। ঘরে বসেই নামাজ আদায় করেছেন ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা। এছাড়া করোনার বিস্তার রোধে ঘরে থাকার আদেশসহ কারফিউ জারির কারণে ছিল না উৎসবের কোনো আমেজ।

সাধারণত ঈদের তিন দিন বিশ্বের ১৮০ কোটি মুসলিমের জন্য ঈদুল ফিতর বছরের বৃহত্তম এক উৎসব। এক মাস ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে মানুষ আল্লাহর ইবাদত করেন। রমজান শেষে ঈদ উৎসবে তাই বিশেষ আয়োজনে খাবারেও লাগে ধুম। কিন্তু এবার এসব মানুষ পরিবার-স্বজন ছাড়াই একাকী ঈদ করছে।

কিছু দেশ যেমন তুরস্ক, ইরাক আর জর্ডানে তো ঈদের ছুটিতেও চলছে ২৪ ঘণ্টার কারফিউ। তবে অনেক দেশে এসব বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করা হলেও অর্থনৈতিক স্থবিরতা আর করোনার বিস্তারের শঙ্কায় জারি বিধিনিষেধের কারণে ঈদ উৎসবে যে আমেজ তৈরি হয় তা দেখা যায়নি।

মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান মক্কা ও মদিনা এলাকা ঈদেও ছিল সম্পূর্ণরুপে লকডাউন। মানুষ ঈদের নামাজ পড়তে এর কোনোটাতেই যেতে পারেননি। ঘরে বসেই সবাইকে নামাজ আদায় করতে হয়েছে। শুধু খাবার আর ওষুধের মতো নিত্য প্রয়োজনীয় দব্য কেনার জন্য অনুমতি মিলছে বাইরে বের হওয়ার।

জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদের সামনে বিক্ষোভ করার সময় দুজনকে গ্রেফতার করেছে ইসরায়েলি পুলিশ। গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য অন্যতম পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত এই মসজিদের ভেতর নামাজ আদায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মুসল্লিরা তা মানছিলেন না।

প্রতি বছর ঈদের সময় হাজার হাজার মানুষ মক্কা-মদিনার পর মুসলিমদের তৃতীয় পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত আল-আকসা পরিদর্শনে যান। কিন্তু এবার পরিদর্শন তো হয়নি সেখানে ঈদের নামাজ পড়ার সুযোগও পায়নি মানুষ। কবে তা খুলে দেওয়া হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে করোনার প্রকোপে সবচেয়ে কাবু হওয়া ইরান কিছু মসদিজে নামাজ আদায়ের অনুমতি দিলেও রাজধানী তেহরানের বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে যে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এই জামাতের নেতৃত্ব দেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনি।

বিশ্বের সর্বোচ্চ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ ইন্দোনেশিয়ায় ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়া করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে জারি রয়েছে লকডাউন। সেখানে ঈদগাহ কিংবা মসজিদে নামাজ আদায়ের ওপর রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে বাইরে থাকা পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে ফিরতে পারেনি।

পাশের আরেক দেশ মালয়েশিয়ায় কয়েক সপ্তাহ ধরে চলার পর কিছু ব্যাবসাকেন্দ্র খুলেছে। কিন্তু জনসমাগমের ওপর এখনো জারি রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। ছুটি হলেও নিজের শহরে কিংবা গ্রামে ফিরতে পারেননি কেউই। পুলিশ বাড়ির পথে যাওয়া ৫ হাজার ব্যক্তিগত গাড়ি আটকে তা ফেরত পাঠিয়েছে। যারা বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করবে তাদের কঠোর জরিমানার মুখে পড়তে হবে বলে আগে থেকেই সতর্ক করে দিয়েছিল দেশটির সরকার।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া রোহাইজাম জাইনুদ্দিন বাড়িতে ছিলেন। দাদির সঙ্গে ঈদ করতে পেরে আনন্দিত এই তরুণ বলেন, ‘অন্য বছরের তুলনায় এবার ঈদ ভিন্নরকম বলে আমরা হতাশ। তবে রেগে যাওয়ার মানে নেই। আমাদের এটা মেনে নিতে হবে, কারণ জীবন তো থেমে থাকে না।’

সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবারই প্রথমবারে মতো পাকিস্তানে একই দিনে ঈদ উদযাপিত হয়েছে। কিন্তু একে তো মহামারি করোনভাইরাসের ব্যাপক বিস্তার তার ওপর শুক্রবার বিমান বিধ্বস্ত হয়ে প্রায় একশ মানুষের মৃত্যুর পর দেশটিতে চলছে শোকের সময়।

পাকিস্তানে গত মার্চ থেকেই করোনার বিস্তার রোধে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও মসজিদ বন্ধ করার বিষয়ে একমত ছিলেন না প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা সত্ত্বেও তাই আজ ঈদে করাচির একটি ঈদগাহ মাঠে হাজারো মানুষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়তে দেখা গেছে।

পাকিস্তানের মতো অবস্থা দক্ষিণ সুদানেও। সেখানেও হাজার হাজার মানুষ সামাজিক দূরত্ববিধি অগ্রাহ্য করে জামাতের সাথে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। তবে বিশ্বের বেশিরভাগে দেশে ঘরে বসেই, আত্মীয়-স্বজনবিহীন এক ঈদ উদযাপন করেছেন বিশ্বের শত কোটি মুসলিম। ঈদের ভার্চুয়াল উদযাপন

মধ্যপ্রাচ্যে ঈদ উদযাপিত হচ্ছে প্রযুক্তির সাহায্যে। অনেক ধর্মীয় নেতা অনলাইনে ঈদ উপলক্ষে বার্তা দিয়েছেন, কোথাও সোশ্যাল মিডিয়ায় একসঙ্গে ঈদ উদযাপন, কোথাও অনলাইনে কনসার্ট। এই যেমন, সান্তিয়াগোর ইসলামিক সেন্টার অব চিলিতে গতবছর ঈদ উপলক্ষে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কয়েকজন ধর্মীয় নেতা এসেছিলেন, তারা বিভিন্ন ধর্মীয় বয়ান করেছিলেন। সেন্টারের মুসা জানান এবার আর তা সম্ভব হয়নি, তাই এবার তাদের বয়ান শোনা হয়েছে অনলাইনে। অনেকে ঈদে বাসায় কী রান্না করেছেন তা বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে ভিডিও কলে শেয়ার করছেন। ভারতেও ঈদ উদযাপনে আজ মলিন ভাব ছিল। হিন্দুস্তান টাইমসকে মুম্বাইয়ের বাসিন্দা সাদাফ মোহতেশাম বলেছেন, ‘প্রতি ঈদেই পরিবার ও নিজের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনি। কিন্তু এবছর কেউই ঈদে নতুন কিছু কেনেনি। আমি আমার বোনের বাসায় চাঁদ রাতে গিয়ে হাতে মেহেদী দিতাম। এবার সেরকম কিছু করা হয়নি। ভারতে ক্রমবর্ধমান কভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা ঈদের সব উদযাপন ও আনন্দকে মাটি করে দিয়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে সাদামাটাভাবে ঈদ উদযাপন করতে পেরেই আমি খুশি।’

দুর্যোগ, বিপর্যয় যতই আসুক না কেনো এবাদত বন্দেগী থেমে থাকবে না। আর এই কঠিন সময়ে শরিয়ত স্বীকৃত পদ্ধতিতে ইসলামের হুকুম পালনের কথা বলছেন আলেম ওলামারা।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

ঈদ-উল-ফিতর পালিত,করোনাভাইরাস,লকডাইন,মুসলিম দেশ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close