• শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

করোনা মোকাবেলায় ডাক্তার হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছেন ব্রিটেনের এমপিরা

প্রকাশ:  ১০ এপ্রিল ২০২০, ১২:২৯
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেশে দেশে ভয়াবহ ছোবল বসিয়েছে করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯। এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী হু হু করে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা।গড়ছে মৃত্যুর নতুন রেকর্ড। ফলে স্বাভাবিকভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ।এশিয়া মহাদেশ থেকে শুরু হলেও এখন ইউরোপের ওপর চেপে বসেছে নতুন এ ভাইরাস। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কয়েকজন সাংসদ অর্থাৎ এমপি দেশের করোনা মহামারী জরুরী অবস্থার ‍শুরুর পর জনগণের সেবায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কাজে যোগ দিয়েছেন। এই এমপি’দের মধ্যে কেউ ডাক্তার কিংবা নার্স হিসেবে একদা কর্মরত ছিলেন।

সম্প্রতি বৃটিশ সরকার করোনা মোকবেলায় দেশের সব ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজে যোগ দেয়ার আহবান জানায়। এই দেশ ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম এমনিই এক সংকটময় মুহুর্ত পার করছে যেখানে হাসপাতালগুলোতে রোগীদের প্রাণ বাচাঁতে কিংবা মৃত ব্যক্তির সৎকার সম্পন্ন করতেই সরকারের যেন কূল-কিনারা হারিয়ে ফেলার উপক্রম।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনগণের সেবার জন্য সংসদে স্থানীয় একজন ব্যক্তিকে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন করা। আর এই সাংসদ অর্থাৎ এমপি তার এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ সহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় উন্নয়নের জন্য কাজ করেন। এই এমপি অন্য সবার মতো যার পরিবার, কাজ এবং অন্যান্য দায়িত্ব আছে কিন্তু তিনি একটু ব্যতিক্রম যার জন্য সবাই তাকে একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করে। তবে এই এমপি কতটুকু নিঃস্বার্থ আর তার জনগণের প্রতি দায়িত্বের পরিচয় পাবেন যখন দেশ ও জাতি কোনো সংকটময় মুহুর্তের সম্মুখীন হয়।

ব্রিটেনের কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির কয়েকজন এমপি আজ দেশের জনগণের জীবন রক্ষায় আবারও তাদের পুরোনো পেশায় ফিরে গেছেন। এটি আমাদের জন্য একটি শিক্ষণীয় ব্যাপার। কারণ অনেক দেশে এই মহামারী মোকাবেলায় ডাক্তার-নার্সরা কাজে আসতে অপারগতা প্রকাশ করছেন। ইংল্যান্ড সহ অন্যান্য দেশে করোনার চিকিৎসা প্রদানকালীন সময়ে অনেক ডাক্তার-নার্স মৃত্যু কোলে ঢলে পড়েছেন। তারপরও ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ এই অনুপ্রেরণায় উদ্বোদ্ধ হয়ে মানবতার কল্যাণে মনুষ্য প্রাণ রক্ষায় অনেকে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন।

সপ্তাহ দুয়েক আগে যখন করোনা ভাইরাসকে মহামারী ঘোষণা করে বিলেতে লকডাউন ঘোষণা করা হয় তারপর থেকে এই রোগের সক্রমণে হাসপাতালে অসুস্থ রোগী এবং মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যেতেই থাকে। ইংল্যান্ডের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ডাক্তার-নার্স না থাকায় এই ধকল সামলাতে সরকারকে হিমশিত পেতে হচ্ছে। তাই জাতির এই দুযোর্গময় মুহুর্তে এমপি‘রা নিজেদের পদমর্যাদা ভুলে স্থানীয় হাসপাতালে অন্যান্য ডাক্তার-নার্সদের কাজ শুরু করেছেন। ক্ষমতাশীন কনজারভেটিভ পার্টির সিফোর্ড এন্ড নর্থ হাইকহাম আসনের এমপি ক্যারোলিন এলিজাবেথ জনসন যিনি একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। জরুরী অবস্থা ঘোষণার পর তিনি পিটারবরো সিটি হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত রোগী বিশেষত শিশুদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

“আজ জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে আমার অনুরোধ দেশের সব ডাক্তার এবং নার্সদের প্রতি বিশেষভাবে যারা অবসরে আছেন, আপনার এগিয়ে আসুন মানুষের জীবনকে রক্ষা করতে। আজ সময় এসেছে আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করার আর আমি আছি আপনাদের সাথে।”

বিরোধী দল লেবার পার্টির টোটিং আসনের এমপি এবং শ্যাডো মানষিক স্বাস্থ্যমন্ত্রী রোজীনা এলিন খান যিনি একজন সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পরও খন্ডকালীন ডাক্তার হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু করোনা মহামারী জরুরী অবস্থা শুরু হওয়ার পর তিনি লন্ডনের একটি হাসপাতালে দিনের পুরোটা সময় রোগীদের সেবায় নিয়োজিত। এমপি রোজীনা বলেন, আমাদের হাসপাতালে ডাক্তার-নার্সরা মানুষের জীবন রক্ষায় দিনরাত কাজ করছে। এই ডাক্তার-নার্সরা হয়তো কারো বাবা, মা কিংবা ভাই, বোন অথবা বন্ধু কিন্তু আজ তারা মানবতা কল্যাণে নিজের জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন। ইতিমধ্যে সেবা প্রদানকালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মী মৃত্যুবরণ করেছেন। যা আমাদের জন্য সত্যিই কষ্টের। কিন্তু এরপরও আমাদের সেবার কার্যক্রম থেমে নেই।

বর্তমান কনজারভেটিভ সরকারের আমল থেকেই এনএইচএসের বাজেটের বরাদ্ধ অর্থের পরিমাণকে এতই সীমিত করা হয়েছে যার প্রভাব এই করোনা মহামারীতে চোখে পড়ার মতো। আমাদের প্রয়োজনীয় ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মী নেই। এছাড়া করোনা রোগ মোকাবেলায় প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জামও নেই। রোগীদের পাশাপাশি হাসাপাতালের কর্মকর্তা, ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জীবনটাকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। এই সংকট মোকাবেলায় সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারণ জনগণের স্বাস্থ্য সেবা সুনিশ্চিতকরণের পাশাপাশি ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখভালের দায়িত্ব সরকারের। কনজারভেটিভ পার্টির লুইস আসনের এমপি এবং সহকারী হুইপ মারিয়া কারফিল্ড সম্প্রতি তার পুরোনো পেশা নার্সিংয়ে যোগ দিয়েছেন। অতীতে তিনি লন্ডনের রয়েল মারসডেন হাসপাতালে কাজ করতেন। মারিয়া বলেন, জনগণের সেবাই হলো আমার মূল লক্ষ্য। তাই এটি আমি যেভাবেই পারি আমার সবকিছু দিয়ে করবো। আমি হাসাপাতালে রোগীদের সেবা প্রদানে প্রতিশ্রুতীবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন আমার এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন।

কনজারভেটিভ পার্টির সেন্ট্রাল সাফক এন্ড নর্থ ইপসুইচ আসনের এমপি ডেনিয়াল লিয়োনার্ড জেমস পোল্টার প্রতিদিন প্রায় ২০ ঘন্টার মতো লন্ডনের বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে কাজ করছেন। মূলত এমপি ডেন একজন সাইকোলজিস্ট। করোনায় আক্রান্ত রোগীদেরকে মানষিক চিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্যে তিনি অক্লান্তভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এই ক্রান্তিকালে। বিরোধী দল লেবার পার্টির নটিংহাম ইস্ট আসনের এমপি নাদিয়া ইদিথ হোয়াটমো তার নির্বাচনী এলাকায় করোনা ভাইরাসের প্রকোপ ‍শুরুর সাথে সাথেই একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছেন। নাদিয়া মাত্র ২৩ বছর বয়সে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে তিনি নটিংহামে স্বাস্থ্যকর্মীর কাজ করতেন। এমপি নাদিয়া বলেন, কনজারভেটিভ সরকারের বাজেট সংকোচনের কারণে আমাদের হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার এবং নার্সের অভাব চোখে পড়ার মতো। এই মহামারী করোনা মোকাবেলায় আমাদের হাসপাতাল, কেয়ার হোমগুলোকে বেগ পেতে হচ্ছে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার গ্রামের বিভিন্ন হাসপাতাল এবং কেয়ার হোম গুলোতে একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কাজ করবো। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার দায়িত্ব শুধু সংসদে দাড়িয়ে বক্তব্য দেয়া নয় বরং আমার দেশ এবং মানুষের সংকটময় সময়ে পাশে দাড়ানো এবং পরিস্থিতি উন্নয়নে নিজে কাজ করা।

কনজারভেটিভ পার্টির ভেইল অব ক্লিড আসনের এমপি জেমস ডেভিস পেশায় একজন ডাক্তার। তিনি শীঘ্রই তার এলাকায় করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবায় স্থানীয় হাসপাতালে কাজে যোগ দিবেন।

কনজারভেটিভ পার্টির ক্রিউ এন্ড ন্যান্টউইচ আসনের এমপি ক্যারেন মুলান তার স্থানীয় এলাকায় ডাক্তার হিসেবে রোগীদের সেবায় কাজ করবেন। এমপি মুলান বলেন, আজ জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে আমার অনুরোধ দেশের সব ডাক্তার এবং নার্সদের প্রতি বিশেষভাবে যারা অবসরে আছেন, আপনার এগিয়ে আসুন মানুষের জীবনকে রক্ষা করতে। আজ সময় এসেছে আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করার আর আমি আছি আপনাদের সাথে।

প্রসঙ্গত, প্রাণহানিতে শীর্ষে অবস্থান করছে ইউরোপের কয়েকটি দেশ। এর মধ্যে ১৮ হাজার ২৭৯ জন নিয়ে প্রাণহানিতে এখনো শীর্ষে রয়েছে ইতালি। এ ছাড়া স্পেনে ১৫ হাজার ৪৪৭, ফ্রান্সে ১২ হাজার ২১০, যুক্তরাজ্যে ৭ হাজার ৯৯৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ১৬ হাজার ছাড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ প্রাণহানী হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে ১ হাজার ৯০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ফ্রান্সে ১ হাজার ৩৪১ জন এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।উৎপত্তিস্থল চীনে মৃতের সংখ্যা তিন হাজার ৩৩৭। যদিও দেশটির বিরুদ্ধে প্রকৃত পরিস্থিতি গোপন করার অভিযোগ রয়েছে।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

করোনা,যুক্তরাজ্য,সংসদ সদস্য
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close