Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৬ আশ্বিন ১৪২৬
  • ||

রোহিঙ্গাদের গ্রাম ধ্বংস করে সরকারি অবকাঠামো নির্মাণ করছে মিয়ানমার

প্রকাশ:  ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৪:১৫
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট icon

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ধ্বংসাত্মক তৎপরতা, নির্যাতন চলছেই। এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে এখন অনাহারে মারছে তারা।

মুসলিম রোহিঙ্গাদের সব গ্রাম গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে পুলিশ ব্যারাক, সরকারি ভবন ও শরণার্থী ক্যাম্প নির্মাণ করছে মিয়ানমার। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে। স্যাটেলাইট চিত্র থেকে বিবিসি জানতে সমর্থ হয়েছে, কমপক্ষে চারটি রোহিঙ্গা গ্রামকে পুরোপুরি সরকারি অবকাঠামোতে রূপান্তর করা হয়েছে।

বিবিসি তাদের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানায়, যেসব অঞ্চলে আগে রোহিঙ্গাদের বসবাস ছিল সেসব যায়গা এখন পুরোপুরি সরকারি অবকাঠামোতে রূপান্তর করা হয়েছে।

এমন চারটি রোহিঙ্গা গ্রামকে দেশটির সরকার পুরোপুরি সরকারি অবকাঠামোতে রূপান্তর করেছে, স্যাটেলাইট চিত্র থেকে বিবিসি তা জানতে সমর্থ হয়েছে। তবে দেশটির কর্মকর্তারা এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনা অভিযান বন্ধের ঘোষণা দিয়ে আগস্টে আবারও ক্লিয়ারেন্স অপারেশনের (শুদ্ধি অভিযান) ঘোষণা দেয় মিয়ানমার। রিগনভিত্তিক মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ইউরো এশিয়া রিভিউ ২০১৮ সালের মার্চের শুরুতে জানায়, ২০১৭ সালে শেষ থেকে মিয়ানমার সরকার ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কমপক্ষে ৪৫৫টি গ্রামের সব অবকাঠামো ও ফসলের ক্ষেত ধ্বংস করে দিয়েছে। জানুয়ারিতে অ্যামনেস্টির সবশেষ গবেষণায় রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বহু গ্রাম জ্বালিয়ে ও বুলডোজারে গুড়িয়ে দেওয়ার আলামত উঠে এসেছিল। ফেব্রুয়ারিতে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দাবি করে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী অর্ধশতাধিক গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ওই বছর মার্চের শুরুতে নতুন করে অ্যামনেস্টির দেওয়া বিবৃতি থেকে অন্তত ৩টি সামরিক ঘাঁটি ও রাস্তাঘাট নির্মাণ চলমান থাকার কথা জানা যায়। এবার বিবিসির প্রতিবেদনেও গ্রাম নিশ্চিহ্ন করে সরকারি অবকাঠামো নির্মাণের প্রমাণ উঠে এলো।

২০১৭ সালে রাখাইনে সেনাবাহিনীর কথিত শুদ্ধি অভিযান শুরুর কিছুদিন পরেই মিয়ানমার সরকারের তত্ত্বাবধানে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের মতো করে বিবিসির সাংবাদিকও সেখানে যান। তখন কর্মকর্তারা রাখাইন রাজ্যের ওই গ্রামগুলোতে ভবন নির্মাণের বিষয়টি অস্বীকার করেন। সেখানে প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল। পুলিশি নজরদারির বাইরে সেখানকার মানুষের সাক্ষাৎকার ও চিত্র গ্রহণে সাংবাদিকদের অনুমতি ছিল না। বিবিসি তাদের নতুন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ওই সরকারি সফরে গিয়েও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে জাতিগতভাবে নির্মূলের স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে তারা। তবে এ ব্যাপারে সরকারি কর্তৃপক্ষ বিবিসির সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়নি।

রোহিঙ্গা গ্রামের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করেছে অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তারা ধারণা করছে, ২০১৭ সালে ক্ষতিগ্রস্ত কমপক্ষে ৪০ ভাগ রোহিঙ্গা গ্রাম সম্পূর্ণরুপে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটাকে ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে জাতিসংঘ। তবে সেনাবাহিনীর ওই বড় আকারের হত্যাকে অস্বীকার করেছে মিয়ানমার।

বিবিসির প্রতিবেদক জনাথন লিখেছেন, ‘সরকার আমাদের হলা পো কওং ট্রান্সজিট ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের দাবি অনুযায়ী সেটি ছিল সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনকারী ২৫ হাজার রোহিঙ্গার অস্থায়ী নিবাস। ২০১৭ সালে সহিংসতার পর দুইটি গুঁড়িয়ে দেওয়া রোহিঙ্গা গ্রাম হও রি তু লার এবং থার জেই কোনে’র পাশে ওই ক্যাম্প নির্মাণ করা হয়েছে। কথা ছিল, স্থায়ী আবাসে যাওয়ার পূর্বে তারা দুই মাসের জন্য এখানে অবস্থান করবে। এক বছর আগে ক্যাম্পটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। সেটি এখন বেহাল দশায় রয়েছে। সেখানে সাধারণ টয়লেটগুলো ভেঙ্গে পড়েছে।’

বিবিসির প্রতিবেদক জানান, কেন গ্রামগুলোকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে; তাদের পক্ষ থেকে এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল ওই ক্যাম্পের প্রশাসক সোয়ে সেউ অং’কে। বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। ‘যখন আমি স্যাটেলাইটের চিত্র দেখিয়ে নির্দিষ্ট করি তখন তিনি দাবি করেন, তিনি সেখানে সম্প্রতি চাকরি নিয়েছেন। তার এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার এখতিয়ার নেই।’ লিখেছেন সাংবাদিক জনাথন।

সরকারি সফরের অংশ হিসেবে একটি পুনঃস্থাপিত শিবির কেইন চুয়াংয়ে গিয়েছিলেন সাংবাদিক জনাথন। ফিরে আসা শরণার্থীদের জন্য দীর্ঘ মেয়াদী আবাসনের জন্য জাপান ও ভারতীয় অর্থায়নে সেখানে ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। ওই ক্যাম্প নির্মাণের জন্য ভূমি পরিষ্কার করতে রোহিঙ্গা গ্রাম নামে পরিচিত মেইর জিনকে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যার খুব কাছে বর্ডার গার্ড পুলিশের অনেক নতুন ব্যারাক রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতার অভিযোগ রয়েছে। তবে ক্যামেরার বাইরে কর্মকর্তারা মেইর জিন রোহিঙ্গা গ্রাম গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

প্রধান শহর মুয়াংদাও’র ঠিক বাইরে অবস্থিত মিও থিউ জিই নামের একটি রোহিঙ্গা গ্রাম। যেখানে ৮ হাজারের অধিক রোহিঙ্গার আবাস ছিল। জনাথন তার প্রতিবেদনে বলেন, ‘২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর আমি মিও থিউ জিই’র চিত্র নিয়েছিলাম। অনেক গ্রাম আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে অনেক বড় ভবন অটুট ছিল। রাখাইন গ্রামগুলোর চার পাশে এখনও গাছপালা ছিল। তবে সেখানে এখন বড় সরকারি ও পুলিশ ভবন হয়েছে। গাছগুলো হারিয়ে গেছে।’

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। ছড়িয়েছে বিদ্বেষ। ৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের। এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র, কখনও নীলচে সবুজ রঙের রশিদ, কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রং-বেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। ধাপে ধাপে মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে। ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর একটি প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। তবে সেই থেকে এখন পর্যন্ত একজন মানুষেরও প্রত্যাবাসন করা হয়নি। গত মাসে নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাটির অভিযোগ, যেসব রোহিঙ্গা গ্রাম ছাড়তে চাচ্ছে না, কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যমূলক তৎপরতার ফলে তাদের না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। আগের মতো হত্যা, ধর্ষণ ও গ্রামগুলো ব্যাপকভাবে জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে নিরাপত্তা বাহিনী এখন রোহিঙ্গা নির্মূলে নীরব এবং আরও সূক্ষ্ম ধ্বংসাত্মক পন্থা অবলম্বন করছে।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

রোহিঙ্গা,মিয়ানমার,রাখাইন,বিবিসি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত