• শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

গরিব মন্ত্রী সারেঙ্গির হাতে রক্তের দাগ, রক্তাক্ত তলোয়ার!

প্রকাশ:  ০১ জুন ২০১৯, ২৩:২৬ | আপডেট : ০২ জুন ২০১৯, ০০:১৫
আনিসুর রহমান

মোদির মন্ত্রিসভায় যেকজন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন এর মাঝে সবচেয়ে আলোচিত এবং সমালোচিত ব্যক্তি প্রতাপ চন্দ্র সারাঙ্গি। বৃহস্পতিবার যখন ভারতের নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিচ্ছিল, তখন সবচেয়ে বেশি করতালি পড়েছিল তার বেলায়। যিনি সম্বলহীন একজন মানুষ হিসেবে মোদীর মন্ত্রিসভায় পশুমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। নিজের রাজ্য উড়িষ্যার বাইরে তাকে খুব কম মানুষই চেনেন। কিন্তু গত সপ্তাহে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন।

কিন্তু সদ্য জনপ্রিয়তা পাওয়া এই প্রতাপ চন্দ্র সারাঙ্গি আসলে কে? তার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালে ওড়িষ্যায় কুষ্ঠরোগগ্রস্ত, অচ্ছুতদের সেবাদেয়ায় অস্ট্রেলিয়ান মিশনারির পাদ্রী গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টেইনস ও তার দুই শিশু সন্তানকে পুড়িয়ে মারার জন্য হত্যা মামলার আসামি হলেও কিন্ত ওই মামলায় রেহাই পেয়ে যান তিনি। ২০০১ এর ১৬ ডিসেম্বর ওড়িষ্যা বিধানসভায় ধর্ণার নামে তাণ্ডব চালিয়ে আহত করেন বিধায়ক অশোক পানিগ্রাহীসহ ৬৭ সাংবাদিককে। সেদিন তিনি গ্রেফতারও হন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে হত্যা, সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও মুসলিম নির্যাতনের ৭৫টি মামলা চলমান রয়েছে। বজরং দলের এ উগ্র সাম্প্রদায়িক হায়েনাকে মহামানব হিসেবে উপস্থাপন করছে কালো টাকা নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম। সারাঙ্গি তখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন খ্রিস্টান মিশনারীরা পুরো ভারতকে ধর্মান্তরিত করার শয়তানি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। যারা তখন মিস্টার সারাঙ্গির সাক্ষাৎকার নেন তাদের একজন ছিলেন উড়িষ্যার সাংবাদিক সন্দীপ সাহু।

সেই সাক্ষাৎকারে মিস্টার সারাঙ্গি যদিও খ্রিস্টান মিশনারী গ্রাহাম স্টেইনস এবং তার দুই সন্তানকে হত্যার নিন্দা করেন, ধর্মান্তরের বিরুদ্ধে তিনি তার শক্ত দৃষ্টিভঙ্গীতে অনড় ছিলেন।

২০০২ সালে বজরং দলসহ ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীগুলো উড়িষ্যা রাজ্য বিধান সভায় হামলা চালায়। এই ঘটনায় মিস্টার সারাঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অগ্নিসংযোগ, হামলা এবং সরকারি সম্পদের ক্ষতি করার অভিযোগ আনা হয়।

তবে ২০০৩ সালে দীর্ঘ বিচার শেষে এই ঘটনায় মোট ১৩ জনকে সাজা দেয়া হয়। তাদের একজন দারা সিং ছিলেন বজরং দলের সদস্য। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। উড়িষ্যার হাইকোর্ট দুবছর পর অবশ্য তার মৃত্যুদণ্ড রদ করে দেয়। সেই সঙ্গে আরও ১১ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামীকে মুক্তি দেয় আদালত। কারণ তাদের সাজা দেয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বজরং দলের দারা সিং প্রকাশ্যে এই হত্যায় সামিল ছিলেন। তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু কার্যকরের রায় দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তিতে এই রায়কে পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন করা হয়। পরবর্তীতে সুপ্রীম কোর্ট এক আদাশে বলেছিলেন, ‘দরিদ্র উপজাতিদের খৃস্টান বানানোর চেষ্টা করায় শিক্ষা দেওয়ার জন্যই স্টুয়ার্টকে তার দুই পুত্রসহ ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিলো।’ না। দারা সিংয়ের কিছু হয়নি।

বলা হয়ে থাকে সেদিন স্টুয়ার্ট ও তার দুইপুত্রকে এই প্রতাপ সারাঙ্গীর নির্দেশেই হত্যা করা হয়েছিলো। দারা সিংরা ছিলেন কেবল হুকুম তামিল করা খুনী। মূলে ছিলেন ওই প্রতাপ। তারা সাধারণ জীবন যাপন করলেও ধর্ম রক্ষায় তারা মুসলিম জঙ্গিদের থেকেও কম যান না।

বজরং দল ভারতের অত্যন্ত সুপরিচিত মৌলবাদী গোষ্ঠী। জয়শ্রী রাম বলে স্লোগান তুলে এরা ভিন্ন ধর্মালম্বীদের গলায়, বুকে ত্রিশূল বসিয়ে দিতে কার্পণ্য করে না। এরা মুসলিম জঙ্গিদের মতোই হিন্দু ধর্মের ঠিকাদারি। ধর্ম রক্ষায় এরা সদাজাগ্রত। মোদীর মন্ত্রী সভাতে প্রতাপের মতো দরিদ্র ব্যক্তি ঠাঁই পেয়েছেন ভেবে যারা বগল বাজাচ্ছেন তারা এবার ভাবুন, মুসলিমদের মধ্যেও এমন হতদরিদ্র ব্যক্তি রয়েছেন যারা ধর্ম রক্ষায় একটা নয় একশোটি খুনও করতে পারেন। এরা আদতে মানবতা পরিপন্থী হিংস্র বলেই মনে করি।

বৃহস্পতিবার সারাঙ্গি যখন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তখন সমর্থকরা আতশবাজি পুড়িয়ে এবং মিষ্টি বিতরণ করে তাদের উল্লাস প্রকাশ করেন। কেউ কেউ তাকে এরই মধ্যে 'উড়িষ্যার মোদি' বলে বর্ণনা করতে শুরু করেছেন।

বাস্তবতা হলো, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো একটা ছবি বা কোনো একজনের গল্প সেখানে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করছে। এর ফলে কোনো ব্যক্তি অতীতে কী করেছেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনেই তাকে লোকজন নায়কে পরিণত করছে। (সূত্র: বিবিসি, ইন্টারনেট এবং ডিএম রেজাউল করিমের ফেসবুক স্ট্যাটাস)

পিপিবিডি/ এআর

সারেঙ্গি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত